বগুড়ায় দ্বিতীয় দিনেও উদ্ধার হয়নি শিশুর খণ্ডিত মাথা, অভিযান সমাপ্ত

তাহানুল মারুফ
জুন ৪, ২০২৪

Share Now

বগুড়া শাজাহানপুরের বনানীতে শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলে স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় শিশুর খণ্ডিত মাথা উদ্ধারে করতোয়া নদীতে রোববার (২ জুন) সারাদিনেও সন্ধান মেলেনি। সোমবার (৩ জুন) দ্বিতীয় দিনে রাজশাহী থেকে আসা ডুবুরি দল সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত করতোয়া নদীতে উদ্ধার অভিযান চালিয়েও ওই শিশুর খন্ডিত মাথা উদ্ধার করতে না পারায় এই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বগুড়া জেলা পুলিশ গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজ হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে তার নেতৃত্বেই গতকাল আরেক দফা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।

উল্লেখ্য, বগুড়া শাজাহানপুরের বনানীতে রোববার শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলে স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে গলাকেটে হত্যা করে পালানোর সময় স্বামী সেনা সদস্য আজিজুল হককে (২৪) আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে হোটেল কর্তৃপক্ষ। শনিবার দিবাগত রাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। আটক আজিজুল হক (২৪) বগুড়ার ধুনট উপজেলার হেউটনগর গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমানের ছেলে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার নারী ও তার শিশুসন্তানের খণ্ডিত দেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হলেও খণ্ডিত মাথা রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। তবে ঘাতক বাবার জবানবন্দি অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল করতোয়া নদীতে উদ্ধার অভিযান চালালেও মাথাটি উদ্ধার করতে পারেনি।

শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, স্ত্রী আশা মনি (২০) ও শিশুসন্তান আব্দুল্লাহ আল রাফিকে (১) নিয়ে তিন দিন হোটেলে থাকবেন এমন কথা বলে শনিবার সন্ধ্যায় বনানীস্থ শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলের ৩০১ নম্বর কক্ষে উঠেন আজিজুল হক। আজিজুল নিজেকে মিরাজ এবং তার স্ত্রীকে তমা এবং তাদের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ, এই পরিচয় দিয়ে হোটেলের ওই কক্ষ ভাড়া করেন। রাত ১০টায় স্ত্রী-সন্তানকে রেখে বাড়িতে যান আজিজুল। পরদিন সকাল ৯টায় হোটেলে ফিরে ম্যানেজারকে ভাড়া পরিশোধ করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আজিজুল। কিন্তু তার সাথে স্ত্রী-সন্তান না থাকায় হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে আজিজুলকে আটক করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলের ৩০১ নম্বর কক্ষের খাটের নিচে থেকে শিশুসন্তান রাফির মস্তকবিহীন লাশ এবং স্ত্রী আশা মনির লাশ বস্তাবন্দি অবস্থায় টয়লেট থেকে উদ্ধার করে। এরপর থেকেই জোড়া খুনের বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

নিহত আশা মনির বাবা বগুড়া শহরের নারুলী পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশাদুল জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার মেয়ে জামাই তার বাড়িতে বেড়াতে আসে। সেখান থেকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গত শনিবার বিকেলে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় আজিজুল। এরপর রাত ১০টায় আজিজুল তার শ্বশুরকে ফোন করে জানান, শরীর খাারাপ লাগায় আশা মনিকে বাড়িতে পঠিয়ে দিয়ে সে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। এরপর বাড়িতে ফোন করে জানতে পায় আশা মনি বাড়িতে যায়নি। সারারাত চলে খোঁজাখুঁজি।

শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহিদুল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রী-সন্তানকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে আজিজুল হক। সে আরও জানায়, শিশুসন্তানের মাথা বিচ্ছিন্ন করে করতোয়া নদীতে ফেলে দিয়েছে।

বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া ও মুখপাত্র) সদর সার্কেল শরাফত ইসলাম বলেন, রাতে যে কোন সময় আজিজুল তার স্ত্রী ও সন্তানকে গলা কেটে হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দি করে কক্ষের বাথরুমে রাখে এবং ছেলের মাথা বিচ্ছিন্ন করে সকালে শহরের চেলোপাড়ায় করতোয়া নদীতে রেল ব্রিজের নিচে ফেলে দেয়। পুলিশের একটি দল মাথা উদ্ধারের জন্য আজিজুলকে সাথে নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করে। পরে শিশুটির মস্তক উদ্ধারের জন্য রাজশাহী থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল আনা হয় এবং তারা সন্ধ্যা ৬টা থেকে সন্ধ্য সাড়ে ৭টা পর্যন্ত শহরের রেল ব্রিজের আশেপাশে করতোয়া নদীতে উদ্ধার অভিযান চালায়। সর্বশেষ আজকের মত অভিযান স্থগিত করা হয় এবং কাল রোববার সকাল থেকে এই অভিযান আবার শুরু হবে বলে তিনি জানান। আবাসিক হেটেলের ওই কক্ষ থেকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত একটি রাম দা এবং একটি চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী পিপিএম, বিপিএম,(পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি) বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আজিজুল হক পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তার স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আজিজুল হক বলেছে, দাম্পত্য কলহের কারণে সে স্ত্রী, সন্তানকে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।